যুগান্তরের প্রতিবেদনে ফেনীতে জয়নাল হাজারীর নাম এক নাম্বারে

 

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। বিতর্কিত শতাধিক এমপির আসনে জনপ্রিয় প্রার্থীদের খুঁজছে দলটি। অনেককে সবুজ সংকেত দেয়া হয়েছে। ভুল শুধরাতে বিতর্কিত অনেক এমপি ধরনা দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের কাছে। আর এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে মাঠে আরও সক্রিয় হয়েছেন দলটির জনপ্রিয় দাবিদার মনোনয়নপ্রত্যাশীরা।
জানা যায়, সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও দলীয় রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে মনোনয়নের একটি খসড়া তালিকা প্রস্তুত করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যেখানে বিতর্কিত এমপিদের আমলনামাসহ মনোনয়নপ্রত্যাশী নতুনদের ভালো-মন্দ ঠাঁই পেয়েছে। বেরিয়ে এসেছে এমপি না হয়েও ইতিমধ্যে নির্বাচনী এলাকায় জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন যারা। আছে কাদের জয়ের সম্ভাবনা। সূত্র বলছে, তালিকার একটি অংশজুড়ে আছে নেতিবাচক ইমেজে আচ্ছাদিত বেশ কিছুসংখ্যক এমপির হালচাল। কারা একেবারে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন, সিন্ডিকেট আর স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নিয়ে কারা ব্যক্তিস্বার্থে জনস্বার্থ লঙ্ঘন করেছেন, নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য এমপি-মন্ত্রী হয়েও মাঠ পর্যায়ে অনেকটা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন- এমন ব্যক্তিদের নামও আছে এ তালিকায়। জানা গেছে, এ রকম বিপদসংকুল আসনগুলোতে নতুন মুখ তালাশ করা হচ্ছে। এছাড়া ক্ষমতার অপব্যবহার করে ক্যাডার বাহিনী গড়ে তুলে যারা জমি দখল, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, দখলবাজি, নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য, টিআর-কাবিখা প্রকল্প লুটপাট, টেন্ডারবাজি, কমিশন বাণিজ্য ছাড়াও সব মিলিয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজস্ব কায়েম করেছেন- তাদের এক রকম কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অবশ্য আশার কথা, এসব আসনে বিতর্কিত এমপিদের শূন্যতা পূরণে অনেক ত্যাগী ও জনপ্রিয় নেতা তৈরি হয়েছেন। দলের অনেকে মনে করেন, এসব নেতাকে মনোনয়ন দেয়া হলে নির্বাচনী ফল ভালো হবে। তবে পূর্বশর্ত হল- নির্বাচনের আগে দলীয় কোন্দল একেবারে সমূলে উৎপাটন করতে হবে।
প্রসঙ্গত, জনপ্রিয় প্রার্থীদের মনোনয়নের বিষয়ে দলের বিভিন্ন বৈঠকে শেখ হাসিনা একাধিকবার বলেন, বিতর্কিত কাউকে মনোনয়ন দেয়া হবে না। ফলে এ জনপ্রিয় মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটা উজ্জ্বল।
আওয়ামী লীগের ধানমণ্ডির কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২৬ জানুয়ারি থেকে সফরে যাওয়া টিমের নানা পর্যবেক্ষণে সম্ভাবনাময় প্রার্থীদের তুলে আনবেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্রে জমা পড়া এমপিদের বিরুদ্ধে হাজারও অভিযোগের ফাইলও থাকবে নেতাদের হাতে। সফরে গিয়ে এসব অভিযোগের চুলচেরা বিশ্লষণ করবেন তারা। শুনবেন অভিযোগ নিয়ে সাধারণ মানুষের মতামতও। একান্ত বৈঠক করবেন নেতাকর্মীদের সঙ্গে। আর এসব অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ থেকে পাওয়া সারসংক্ষেপের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হবে। তবে মনোনয়ন প্রদানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সংশ্লিষ্ট মনোনয়ন বোর্ড।
এদিকে প্রাথমিক অনুসন্ধানে বিতর্কিত প্রায় শতাধিক এমপিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের আসনে বিকল্প প্রার্থীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশনাও গেছে কেন্দ্র থেকে। সবুজ সঙ্কেত পেয়ে কাজও শুরু করেছেন অনেকে।
সমালোচিত ও ব্যর্থ এমপিদের আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হবে না জানিয়ে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের জরিপ কাজ চলছে। ২৬ জানুয়ারি থেকে ১৫টি টিম মাঠে কাজ করবে। তারাও একটি রিপোর্ট কেন্দ্রে জমা দেবেন। তৃণমূল থেকেও নাম আসবে। ইতিমধ্যে কেন্দ্র থেকে অনেককে সবুজ সঙ্কেত দেয়া হচ্ছে এলাকায় কাজ করতে। পর্যায়ক্রমে আরও অনেককে সবুজ সঙ্কেত দেয়া হবে। তবে মনোনয়ন চূড়ান্তের বিষয়টি নির্ভর করবে জনপ্রিয়তা ও নেতাকর্মী সম্পৃক্ততার ওপর। দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয় এমন কাউকে মনোনয়ন দেয়া হবে না বলেও জানান ফারুক খান।
সম্প্রতি বিরোধপূর্ণ বিতর্কিত ও দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা এমপি ও নেতাদের ঢাকায় ডেকে এনে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এ প্রসঙ্গে গত সপ্তাহে তিনি যুগান্তরকে বলেন, আগামী নির্বাচনে বিতর্কিত ও অগ্রহণযোগ্য কাউকেই মনোনয়ন দেয়া হবে না। আমাদের অনেক ভুল আছে, তা সংশোধন করতে হবে। এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। তবে নিজ নিজ এলাকায় যেসব এমপি বিতর্কিত, আগামী সংসদ নির্বাচনে তাদের মনোনয়ন দেয়া হবে না। বিতর্কিত এমপিদের আসনে বিকল্প প্রার্থী খোঁজা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে তথ্যানুসন্ধানে মাঠপর্যায় থেকে বেশ কয়েকজন এমপির বিষয়ে নেতিবাচক অনেক অভিযোগ পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্ট আসনগুলোতে দলের বিকল্প ও জনপ্রিয় দাবিদার প্রার্থীরাও নড়েচড়ে বসেছেন। আগামী নির্বাচনে দলের আসন ধরে রাখতে মরিয়া তারা। কেউ কেউ কেন্দ্রের সবুজ সঙ্কেত পেয়ে জোরেশোরে প্রচারণা চালাচ্ছেন। অবশ্য তাদের সিটিং এমপি ও তার লোকজনের পক্ষ থেকে প্রবল বাধাও সামাল দিতে হচ্ছে।
ফেনী-২ (সদর) আসনের এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারী। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তিনি। তার বিরুদ্ধে দলীয় নেতাকর্মী হত্যা, নির্যাতনসহ নানা অভিযোগ স্থানীয় আওয়ামী লীগের। এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও সদর উপজেলার ধর্মপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান এম আজহারুল হক আরজু।
আসনটিতে সাবেক এমপি জয়নাল আবেদিন হাজারী প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের সংসদ সদস্য আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামউদ্দিন নদভী। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগেও তিনি জামায়াত ঘরানার লোক হিসেবেই এলাকায় পরিচিত ছিলেন। তার শ্বশুর মোমিনুল হক চৌধুরী জামায়াতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য। দলীয় নেতাদের অভিযোগ, এমপি নদভী দল ও সরকারকে নয়, নিজেকে জাহির করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। উপজেলা পর্যায়ে দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বাদ দিয়ে নদভী দলে জামায়াত-শিবিরের লোকজন ভিড়িয়ে নিজস্ব বলয় সৃষ্টি করেছেন। আসনটিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। এছাড়া চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ নেতা আবু সুফিয়ান, বনফুল গ্রুপের চেয়ারম্যান এমএ মোতালেব, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) নেতা আ ম ম মিনহাজুর রহমান গণসংযোগ করছেন।

স্থানীয় আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করেছেন এমপি নদভী মন্তব্য করে লোহাগাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি খোরশেদ আলম চৌধুরী শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, এমপি নদভী আমাদের পার্টির কেউ নন। তাকে কেন্দ্র হায়ার করে এমপি বানিয়েছে। এমপি হয়ে তিনি জামায়াতের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে তাদের চাকরি দিয়েছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীদের জেলে পুরেছেন, হামলা, নির্যাতন করেছেন।

কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি। ইয়াবা সম্রাট হিসেবে বিশেষ পরিচিত পাওয়া বদিকে নিয়ে শুরু থেকেই বিব্রত আওয়ামী লীগ। অবৈধ সম্পদ অর্জনকারী বদির বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। এতে নিন্ম আদালত ৩ বছরের কারাদণ্ড দিলেও উচ্চ আদালত থেকে জামিনে আছেন তিনি। এছাড়া সন্ত্রাসী তৎপরতা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, চোরাচালান, জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে বদির বিরুদ্ধে। নিজ দলের নেতাকর্মীদের পাশ কাটিয়ে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সখ্য গড়ায় কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতারাও তার ওপর বেজায় ক্ষুব্ধ।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী মহল থেকে জানা যায়, এরকম বিতর্কিত প্রায় একশ’র বেশি এমপি আছেন যাদের আসনে জনপ্রিয় ও ক্লিন ইমজের প্রার্থী খুঁজছে দলটি। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে সফরে যাওয়া টিমের নানা পর্যবেক্ষণে সম্ভাবনাময় প্রার্থীদের ভাগ্য খুলতে পারে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্রে জমা পড়া এমপিদের বিরুদ্ধে হাজারও অভিযোগের ফাইলও থাকছে নেতাদের হাতে। সেসব অভিযোগ অনুসন্ধান করে তারা প্রত্যেকের বিষয়ে পৃথক প্রতিবেদন জমা দেবেন দলীয় প্রধানের কাছে। বর্তমান এমপি এবং মনোনয়নপ্রত্যাশী নতুনদের বিষয়ে সেখানে সাধারণ মানুষের মতামতও তুলে ধরা হবে।

 

Share Button

One thought on “যুগান্তরের প্রতিবেদনে ফেনীতে জয়নাল হাজারীর নাম এক নাম্বারে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *