দানবের সাথে মানবতা

বোরহান উদ্দিন মুহাম্মদ শফিউল বশর

 

“উষার দুয়ারে হানি আঘাত
আমরা আনিব রাঙা প্রভাত,
আমরা টুটাব তিমির রাত,
বাধার বিন্ধ্যাচল “—নজরুল।

বড়ই দুঃখভারাক্রান্ত মনে রাত ৩.০৭ এর সময় টাইপ করতে বসলাম।পরপর বেশ কয়েক নির্ঘুম রজনী অতিক্রমান্তে আজ ঘুমুবার মনস্থ করেছিলাম। কিন্তু ছোট্ট ফাহিমের বিমর্ষ চেহারা আজও ঘুমোতে দিলনা।

২৫/৪/২০১৯ খ্রিস্টাব্দ বৃহস্পতিবার আঞ্জুমানে তৌহীদ বতোফায়লে রশীদ পরিচালিত, দাগনভূঞা অভিরামপুরে অবস্থিত, আল্ হারূনী ইসলামী কমপ্লেক্স ভুক্ত গাউসিয়া আহমদীয়া আমিনিয়া সুন্নিয়া মাদরাসার অফিসে আমরা যখন অবহেলিত বস্তিশিশুদের ঝরে পড়া রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ বিষয়ে আলোচনায় লিপ্ত, তখন সুপার জনাব মাওলানা ক্বারী জহির উদ্দীন সাহেবের মুঠোফোনটি বেজে ওঠল।সহস্র আলিম প্রসবিনী, প্রায় শতাব্দী প্রচীন দীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দাগনভূঞা আজিজিয়া সিনিয়র মাদরাসার জনৈক শিক্ষের কল।হায় আল্লাহ! আমরা যখন মানবতার রাঙা অরুণালোতে অমারজনী নাশের স্বপ্নে বিভোর, তখন নিশাপ্রিয় পিশাচ প্যাঁচার তাণ্ডবে এক সদ্যকিশোরের রক্তে নিজের প্রাতিষ্ঠানিক পোষাক ভেসে যাওয়ার দুঃসংবাদ যে, আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে;ঘুণাক্ষরেও ঠের পাইনি।

মিটিং শেষে সহসুপার জনাব মাওলানা পিয়ারুল ইসলাম হারূনীর ঘরে চায়ের আমন্ত্রণে আমরা যখন তাঁর বাসায় মেহমান, তখন আবারো বেজে ওঠল সুপারের ফোন।তাঁর উদ্বিগ্নতা দেখে আমি বললাম, যান।তিনি গেলেন, আর আমরা চা-নাস্তা করলাম।আমরা সহসুপারের বাসার সিঁড়ি বেয়ে যখন নামছি,তখন সুপারের কল এল।মাওলানা আবূ তাহের মুহাম্মদ শরফুদ্দীন হারূনীর দাগনভূঞা পৌরসভাস্থ কাজি অফিসে তিনি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন বলে জানালেন।ওখানে পৌঁছতেই আমি বড় এক ধাক্কা খেলাম।সকাল ৮.৩৫ টায় শান্ত-শিষ্ট ঈষৎ গম্ভির যে ১১/১২ বছরের কিশোর আমদের সাথে একই গাড়িতে এসে দাগনভূঞা বাজারে নেমে লাজুক হাসি দিয়ে আপন মাদরাসার পথ ধরেছিল, সাড়ে পাঁচ ঘন্টার ব্যবধানে সে-ই মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে বিমর্ষ বসে আছে আমাদের সামনে,পরণে পাঞ্জাবি নেই,পায়জামায় রক্তের দাগ! আমি মনে করেছি খেলতে গিয়ে আঘাত পেয়েছে, অথচ আমার জন্য অপেক্ষা করছিল আরো বিস্ময়কর আরো হতশা ব্যঞ্জক এক দুঃসংবাদ;রীতিমত দুঃস্বপ্নের এক অমারজনী। মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের কামিল পাস তথা পরিপূরণতা লাভকারী সনদে বিভূষিত, মানুষ গড়ার কারিকর নামে অভিহত,যুগাধিককাল শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত এক সহকারি মাওলানাই আঘাত করে তাকে রক্তাক্ত করেছে! ঘটনার বর্ণণা দিতে গিয়ে শিশু মুহাম্মদ সাজ্জাদ হুসাইন ফাহিমের চোখের পানি আমাদেরও কাঁদিয়েছে।পাঞ্জাবি ধুয়ে আলামত বিনষ্টের সম্মিলিত হীন প্রচেষ্টা সত্যিই কলঙ্কজনক এবং সংশ্লিষ্ট সকলের অপরাধ প্রবণতার পরিচায়ক।

#সংক্ষুব্ধ অন্য অনকের মত আমিও মামলার পরামর্শ দেই। পরক্ষণে চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিমর্ষ এক পরিবার।সুতরাং বললাম,শাস্তি ওই দানবের প্রাপ্য,পরন্তু তা-তো পুরো একটি পরিবারও ভুগবে;যেখানে বৃদ্ধ মা-বাবা, স্ত্রী, আমাদের ফাহিমের মত অথবা আরো ছোট্ট শিশুও থাকতে পারে।অতএব মামলা নয়,কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে স্ট্যাম্পে অঙ্গিকার নামা নেওয়ার ব্যবস্থা করুন, যেন আর কোন ফাহিমের রক্তাক্ত হতে না হয়।দানবের সাথে মানবতার এ পরামর্শ শিশু ফাহিমের বাবা মেনে নিলেন।ফাহিমের নীরব সম্মতিও আমি লক্ষ্য করি।

#জনাব নাজমুল হুদা সাহেব! মানবতা শিখুন শিশু ফাহিম ও তার বাবার কাছে, সিনিয়র মাদরাসার বড় হুজুররা! উদারতা শিখুন ছোট মাদরাসার এ ছোট্ট হুজুরের কাছে;সর্বোপরি মাইজভাণ্ডারী ত্বরীকাহর এক অনুসারীর কাছে।

#জনাব! আপনার হাতে হাতকড়া পরানো যেত,বিচারের কাঠগড়ায় দাড় করানো যেত,হয়তো জেলের ঘানিও টানতে হতো,হয়তো চাকুরিও চলে যেত,হয়তো উপোস বিমর্ষ সন্তানের চেহারা দেখে রক্তাশ্রু বইতে হতো, মানববন্ধন,সাংবাদিক সম্মেলন ইত্যাদি করে সম্মান ধুলোয় মিশিয় দেওয়া যেতো; এখন এ সব কিছুই হবেনা।শিশু ফাহিম আপনাকে দাড় করিয়ে দিয়েছে আপনার বিবেকের কাঠগড়ায়। আমরাও অপেক্ষায় থাকলাম,আপনি মানবতার সবক কতটুকু শিখতে পারেন দেখতে।

#পরিশেষ ফাহিমের জন্য রইল,অন্তর-উৎসরিত দু’আ।আব্বু ফাহিম বড় হও অনেক বড়।

Share Button

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *