এল শাহরে রমদ্বান: কল্যাণকামী হও আগুয়ান

 

বোরহান উদ্দীন মুহাম্মদ শফিউল বশর
শাহজাদা হারুয়ালছড়ি দরবার শরীফ

এক বছরে বার মাস। আল্ কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘নিশ্চয় নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃজন লগ্ন থেকেই মাসসমূহের সংখ্যা আল্লাহর নিকট আল্লাহর কিতাবে বার মাস’ (সূরা তাওবা ৩৬ নং আয়াতাংশ)। তম্মধ্যে মাহে রমদ্বান এমন বিশেষত্বে বিশেষিত যে, পুরো বছরের মাসগুলোতে কেবল রমদ্বানকেই আল্লাহ তাঁর নামসমূহ হতে একটি নামে নামকরণ করেছেন। আবূ হুরায়রা (রা.) বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইয়হি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তোমরা (শাহর বা মাস যুক্ত করা ছাড়া) রমদ্বান বলোনা; কেননা রমদ্বান আল্লাহর নামসমূহের একটি’। (সূত্র: আল ফতুহাতুল মক্কীয়্যাহ ১ম খণ্ড ৬০৪ পৃ.) ইবনে আরবী (রা.) উক্ত হাদীস সংকলনোত্তর লিখেছেন, আলোচিত হাদীসের সনদ বা বর্ণনাকারী পরম্পরাস্থ ‘আবূ মা’শর’ মুহাদ্দিসীনে কিরামের দৃষ্টিতে দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও মুহাদ্দিসীনে কিরাম কর্তৃক এ হাদীসটি সংকলিত হওয়ার বিষয়টি হাদীসের বিশুদ্ধতার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ। এ ছাড়াও পবিত্র কুরআনের সূরা বাক্বারাহ’র ১৮৫ নং আয়াতে ‘শাহরু রমদ্বান’ এবং ‘ফামান শাহিদা মিনকুমুশশাহরা’-এ দু’স্থানে যথাক্রমে শাহর বা মাস বিযুক্ত ‘রমদ্বান’ এবং ‘রমদ্বানা’ উল্লেখ না করে ‘শাহরা’ উল্লেখ হেতু হাদীসটি সবলতর হয়।

হিজরী সনের নবম মাস মাহে রমদ্বান। এ মাসেই পবিত্র কুরআনুল করীম অবতারিত হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে, ‘রমদ্বান মাস ওই (মহিমান্বিত) মাস; যাতে মানবজাতির জন্য হিদায়ত, পথ নির্দেশ ও (হক্ব-বাতিলে তারতম্যের) চূড়ান্ত মীমাংসার সুস্পষ্ট নিদর্শন- আল্ কুরআন অবতারিত হয়েছে। সুতরাং তোমাদের যে কেউ এ মাসে বিদ্যমান থাকবে, সে যেন অবশ্য তার সওম ব্রত পালন করে’ (সূরা বাক্বারাহ ১৮৫ নং আয়াতাংশ)।
মুফাসসিরীনে কিরামের মতে কুরআনের বর্ণনালোকে রমদ্বানের বিশেষ রজনী লায়লাতুল ক্বদর-এ লওহে মাহফূয হতে পার্থিব জগতের আকাশে কুরআন অবতারিত হয়। ইরশাদ হচ্ছে, ‘নিশ্চয় আমি তা (কুরআন) ক্বদরের রাতে অবতীর্ণ করেছি’ (সূরা ক্বদর ১নং আয়াত)। কুরআন আরো ঘোষণা দিচ্ছে, ‘ক্বদরের রজনী হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম’ (সূরা ক্বদর ৩নং আয়াত)।
নমস্য পাঠক! ক্বদরের রজনীর মর্যাদা-মহিমার হেতু কুরআন অবতীর্ণ হওয়াই সাব্যস্ত। অনুরূপ রমদ্বান মাসের রোযা পালনের নির্দেশের অন্যতম কারণও কুরআন পাওয়ার কৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থেই। লক্ষণীয় যে, প্রতি রমদ্বান মাসের শবে ক্বদরে কুরআন অবতীর্ণ হয়না ঠিকই, কিন্তু সন-বছর ঘুরে কুরআন অবতারণের স্মৃতিধন্য মাস ও রজনী আসে আর ওই মাসে বিদ্যমান মু’মিনেদের রোযা রাখতে হয় এবং ওই মহিমান্বিত রাতের প্রত্যাশিত কল্যাণ অর্জনের ব্রতে রমদ্বান মাসের শেষ দশ দিন মহল্লা ভিত্তিক ন্যূনতম একজনকে ‘ই’তিকাফ’ গ্রহণ করতে হয়। তদ্রুপ প্রতি রবিউল আওয়াল শরীফে নবী করীম (দ.)’র ধরাধামে আগমন না ঘটলেও আগমনের স্মৃতি বিজড়িত দিন-মাস আসে আর ছাহিবে কুরআনের আগমনের কৃতজ্ঞতায় খুশি উদযাপনের আবশ্যকতা অনিবার্য হয়ে পড়ে। ইরশাদ হচ্ছে, ‘(হাবীব) বলুন, আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতকে কেন্দ্র করে তারা যেন আনন্দ-খুশি উদযাপন করে; এটা তারা যা-ই সঞ্চয় করে (ধন-দৌলত, পুণ্য ইত্যাদি) সমুদয় অপেক্ষা মহোত্তম’ (সূরা ইউনুস ৫৮ নং আয়াত)।
জ্ঞাতব্য যে, কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার রজনী লায়লাতুল ক্বদর হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম আর ছাহিবে কুরআন রহমতে আলম (দ.)’র ইহজগতে শুভাগমন কেন্দ্রিক আনন্দ সারা জীবনের সমুদয় সঞ্চয় অপেক্ষা সর্বোত্তম। প্রতি রমদ্বান মাস ও লায়লাতুল ক্বদরে কুরআন অবতীর্ণ না হওয়ার অবান্তর প্রশ্নে ওই মাস ও রাতের মর্যাদা মহিমা খর্ব না করার প্রশংসনীয় মানসিকতা ১২ রবিউল আওয়াল ও মাহে রবিউল আওয়াল শরীফের ক্ষেত্রেও প্রত্যাশিতই বটে।
এবার আসা যাক, মাহে রমদ্বানের রোযা প্রসঙ্গে। সুস্থ বিবেকসম্পন্ন, প্রাপ্ত বয়স্ক ঈমানদার ব্যক্তি মাত্রই রমদ্বান মাসে বিদ্যমান থাকলে তার ওপর রোযা ফরয। অবশ্য মুসাফির ও রুগ্ন ব্যক্তির জন্য পরবর্তীতে আদায়ের অবকাশ এবং সম্পূর্ণ অক্ষম ব্যক্তির জন্য বিকল্প হিসেবে ‘ফিদ্য়াহ’ প্রদানের বিধানও রয়েছে। এ অবকাশ ও সুবিধার সুবাদে রোযা পালনে তাল-বাহানার আশ্রয় যেমন অনুচিৎ, তেমনি আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ সুবিধাকে অগ্রাহ্য করে নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে নিমজ্জিত করাও উচিৎ নয়।
আমরা যারা আলমে নাসূত বা মনুষ্য প্রকৃতির জগত তথা মনুষ্যলোক অতিক্রম করতে পারিনি, তাদের জন্য পৃথিবীর আকাশে চান্দ্রবর্ষের নবম মাসের নবচন্দ্র দর্শন কিংবা উদয়ের নিশ্চিত জ্ঞান মাত্রই সওম তথা সুবহে সাদিক হতে সূর্য অস্তমিত হওয়া পর্যন্ত ইবাদতের নিয়্যতে পানাহার ও স্ত্রী-সম্ভোগ বিরতি অপরিহার্য। হাদীসে পাকে ইরশাদ হচ্ছে, ‘চাঁদ দেখে রোযা রেখো, চাঁদ দেখেই ঈদ করো’ (মুসলিম শরীফ কিতবুস সিয়াম ২৩৯৫ নং হাদীস)।
ভৌগলিক দূরত্ব হেতু সময়ের ব্যবধান ও চাঁদের উদয়স্থল ভিন্নতার কারণে চান্দ্রমাসের আগমন-প্রস্থানের ভিন্নতা সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা‘আলার সৃজন-বৈচিত্র্যের বিচিত্র লীলা; সুতরাং উদয়ের ভিন্নতার ভিত্তিতে রোযা ও ঈদের আগমনের ভিন্নতা এড়িয়ে সারা বিশ্বে একই দিনে পালনের প্রথা প্রচলন স্রষ্টার সৃষ্টি-বিচিত্রতার এক ধরণের অসম্মান বলেই আমার মনে হয়। এ ক্ষেত্রে আরিফদের হৃদয়-আকাশে মা’রফত-শশী উদয়ে সময়ের ব্যবধান ভিত্তিক আরোপিত বিধানের ভিন্নত প্রণিধানযোগ্য।
উল্লেখ্য যে, যারা আধ্যাত্মিক পরিভ্রমণ যোগে মনুষ্যলোক অতিক্রম করে গিয়েছেন, তাঁরা কেবল রমদ্বান মাসের চাঁদ দেখেন না; বরং আল্লাহর রমদ্বান নামের গুণে গুণাম্বিত হয়েই সিয়াম তথা আল্লাহ ভিন্নতায় কথা, কাজ ও নড়াচড়া বর্জন করেন। চাঁদ দেখা প্রসঙ্গীয় হাদীসের ব্যাখ্যায় মহী উদ্দীন ইবনে আরবী (রা.) এ-ও লিখেন, ‘যখন খোদা পরিচয় লাভকারীর অন্তরাকাশে আল্লাহর রমদ্বান নামের মা’রফত বা পরিচয় শশী উদিত হয়, তখন তার ওপর রোযা ফরয হয় আর ‘ফাত্বিরুস্ সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বি’ নামের পরিচয় চন্দ্র উদিত হলেই ফিত্র বা সৃজন বৈচিত্র্যে মনোনিবেশ আবশ্যক হয়’। (আল ফতুহাতুল মক্কীয়্যাহ ১ম খণ্ড ৬০৬ পৃ.) তিনি সূরা বাক্বারাহ’র ১৮৫নং আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, “শাহরু রমদ্বানা’ অর্থাৎ ‘আল্লাহর নূর বা জ্যোতিতে নফ্স বা জীবাত্মা দাহের ক্ষণ, ওই সময় যাতে সৃজন বা বহু বর্জিত এক তথা আল্লাহর দর্শনে একত্বের পানে মানব সমম্প্রদায়কে পথ নির্দেশকারী জীবাত্মাকে পরমাত্মায় পূর্ণ মনোনিবেশ তথা পরমাত্মার মিলন স্তরে উপনয়নের দিগদর্শন ‘আক্বলে কুরআনী’ খ্যাত সর্ব সমাবেশকারী সামগ্রিক জ্ঞান ও একত্বে বহু এবং বহুতে এক সম্পৃক্ত প্রমাণাদি তথা ‘আক্বলে ফুরক্বানী’ খ্যাত বিশদ ব্যাখ্যামূলক জ্ঞান অবতারিত হয়। অতএব যে কেউ ওই সময় উপস্থিত থাকে বা সত্তা দর্শনের পর্যায়ে উপনীত হয়, সে যেন রোযা বা স্রষ্টার সাঙ্গ বিহীন কথা, কাজ ও নড়াচড়া বর্জন করে। আর যে ব্যক্তি আত্মার অসুস্থতা জনিত কারণে ওই চাক্ষুষ দর্শন প্রতিবন্ধক নফ্সানী পর্দাঢ়ালে অথবা সত্তা দর্শন পর্যায়ে আগুয়ান দূর পথে রয়েছে, তজ্জন্য ওই মকামে পৌঁছা পর্যন্ত অবকাশ অনুমোদিত; আল্লাহ তোমাদের জন্য আল্লাহর কুদরতের সাথে ব্যাপ্তি ও একত্বের স্তরে উপনয়নে সহজতা চান, অক্ষম জীবাত্মাকে সাধ্যাতীত কাজের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া তথা কাঠিন্য চান না। এবং ওই পর্যায়-অবস্থা-স্তরে উপনয়ন পরিপূর্ণ করো এবং আল্লাহর পথ প্রদর্শন মূলে চাক্ষুষ দর্শন পর্যায়ে উপনীত করার কৃতজ্ঞাতায় আল্লাহকে সম্মান করো, তার মহানত্ব অনুধাবন করো; উক্ত স্তরে দৃঢ়পদ থাকার মাধ্যমে’। (সূত্র: তাফসীরে ইবনে আরবী ১ম খণ্ড ৯০ পৃষ্ঠা)
হযরত গাউসুল আ’যম শাহসূফী সৈয়দ আহমদুল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (রা.)’র বাণী ‘আমার ছেলেরা সর্বদা রোযা রাখে’ (জীবনী ও কারামত)। গাউসুল আ’যম (রা.)’র পবিত্র বাণীতে ‘আমার ছেলে’ সম্বোধিত হযরাতে কিরাম সর্বদা রোযা তথা আল্লাহর সাঙ্গ বিহীন কথা, কাজ ও নড়াচড়া বর্জন করে চলেন। অর্থাৎ তাঁরা সর্বদা সায়ির মা‘আল্লাহ বা আল্লাহর সাথে পরিভ্রমণ করেন। উক্ত বাণীমূলে প্রতিভাত যে, গাউসুল আ’যমের ছেলে হওয়ার যোগ্যতায় ভূষিত ব্যক্তিসত্তা মাত্রই আল্লাহর কুদরতের সাথে ব্যাপ্তি লাভকারী একত্বের স্তরে উপনীত; তাঁদের কোন কেউ-ই আত্মার অসুস্থতা জনিত কারণে চাক্ষুষ দর্শন প্রতিবন্ধক নফ্সানী পর্দাঢ়ালে কিংবা সত্তা দর্শন পর্যায়ে আগুয়ান দূর পথে অবস্থানকারী নন। আলহামদুলিল্লাহি ‘আলা যালিকা।
উক্তরূপ অবস্থানে উপনয়নের উচ্চাশার সাথে সাথে তা অর্জনের নিরেট প্রচেষ্টাও আমাদের থাকতে হবে। পরবর্তী আয়াত তথা সূরা বাক্বারাহ’র ১৮৬ নং আয়াতে আমাদের করণীয় বিবৃত হয়েছে। আসুন ইবনে আরবী (রা.)’র ব্যাখ্যাযোগে ওই আয়াতের মর্ম উপলব্ধি করি। ইরশাদ হচ্ছে, ‘(হে হাবীব!) যখন আপনাকে আমার বান্দাগণ (আমার অভিমুখী-অভিযাত্রী-অনুসন্ধানকারী দল) আমার (মা’রফত বা পরিচয়) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, (বলুন) আমিতো নিকটেই (যাহির বা প্রকাশ্য) আছি। আহ্বানকারীর আহ্বানে সাড়া দিই, যখন আমাকে ডাকে (অর্থাৎ অবস্থা ও উদ্যোগের ভাষায় যে আমাকে ডাকে আমি তার অবস্থা ও উদ্যোগের চাহিদা পূরণ করি)। সুতরাং তারা যেন (ইবাদাত ও তপস্যার দ্বারা যোগ্যতাকে শোধনের মাধ্যমে) আমার নির্দেশ পালন করে এবং আমার ওপর আস্থাশীল বিশ্বাসী আশঙ্কামুক্ত রয়; (তবে আমি তাদেরকে আমার পানে ডেকে নেবো, আমার পথের রীতি-নীতি বাতলিয়ে দেবো এবং আত্মা-শোধনকালে তারা আমাকে আপন হৃদয়-দর্পণে প্রত্যক্ষ করবে।) যাতে পথের দিশা (দৃঢ়তা ও যথাযথ যোগ্যতা) পায়’। (সূত্র: তাফসীরে ইবনে আরবী ১ম খণ্ড ৯০ পৃষ্ঠা)
উক্ত আয়াতে আল্লাহর বান্দার জিজ্ঞাসার প্রেক্ষিতেই আল্লাহ নিকটে বলে বিবৃত। এখন আল্লাহকে কেন পাচ্ছিনা? সে জিজ্ঞাসার আগে, আল্লাহর বান্দা হতে পারলমা কিনা? আমরা কি আল্লাহর বান্দা, না প্রবৃত্তির? মুখের বুলিতে-তো আল্লাহকে রব মানি, পরন্তু কার্যক্ষেত্রে নিজের নফ্সকে আল্লাহর সমক্ষ বানিয়ে নিচ্ছি কিনা? তা-ই একবার অনুসন্ধান করা জরুরি। চর্মের চক্ষু মুদিয়ে জ্ঞান-নয়ন-জ্যোতে মনোজগৎ বিচরণব্রতী হলেই আল্লাহ প্রদত্ত দিব্যদৃষ্টিতে আপন অবস্থা পরিদর্শনোত্তর এ বাস্তবতাই দেদীপ্যমান হবে যে, আমাদের কেউ নিজেকে খোদার সমকক্ষ আর কেউ আরো বড় ধারণা করি। এ বাস্তবতা অনুধাবনে হযরত খাজা সুলায়মান তূনসভী ও জনৈক মাওলানার ঘটনা দৃষ্টির পর্দা অপসারণে যথেষ্ট সহায়ক। ঘটনার বিবরণে প্রকাশ যে, এক আলিমে দ্বীন হযরত খাজা তূনসভী (রা.)’র খিদমতে বায়‘আত হতে এসে আবেদন জানালেন যে, ‘হযরত! আমাকে ফক্বর বা দরবেশীর তালিম দিন’। প্রত্যুত্তরে খাজা (রা.) বললেন, ‘আমরা ফক্বীরদলের নিকটতো দরবেশীর একটি মাত্রই সবক; তা হল আর কিছু পার বা না পার, খোদাকে নিজের অপেক্ষা উত্তম না মানলেও অন্তত নিজের মতো জান’। মাওলানা সবিস্ময়ে চমকে ওঠে বললেন, ‘আস্তাগফিরুল্লাহ! আপনি এ-কি বললেন! এটিতো সুস্পষ্ট কুফর। এক অক্ষম মানুষের কিবা সাধ্য যে, নিজেকে আপন খালিক্ব (স্রষ্টা) মালিক (অধিকর্তা) আল্লাহর সমকক্ষ জ্ঞান করবে!’ খাজা (রা.) বললেন, ‘কারো বুঝে আসুক, বা নাইবা আসুক, ফক্বীরদলের পাঠশালায় এটি অন্যতম পাঠ্য।’ অতঃপর আল্লাহর মর্জি নির্ভরতায় সকালে সাক্ষাৎ ও কথা হবে বলে মাওলানাকে মুসাফিরখানায় অবস্থান করতে বললেন। রাতে মাওলানার জন্য বাসি ও তাজা দু’ধরণের রুটি আর তরকারি পাঠালেন। মাওলানা খেতে বসতেই এক অভাবগ্রস্থ দ্বারে হাঁক দিলেন, ‘হযরত! আমি এক মুসাফির; আল্লাহর নামে যদি কিছু পাই’। (আগন্তুকের চাওয়ার রীতির ভিন্নতা সুস্পষ্ট।) মাওলানা বাসি রুটি ও তরকারি দিয়ে দিলেন এবং তাজা রুটি ও তরকারি নিজে খেলেন। অতঃপর প্রভাতে খাজা তূনসভী (রা.)’র খিদমতে উপস্থিত হতেই তিনি (রা.) ওই বাসি রুটি ও তরকারি মাওলানার সামনে রেখে বললেন, ‘মাওলানা! খোদাকে যদি নিজের মতও ধারণা করতেন, তবে আল্লাহর নামে বাসি রুটি ও তরকারি দিতেন না; বরং তাজা রুটি ও তরকারি সমান দু’ভাগ করে অর্ধেক খেতেন আর অর্ধেক আল্লাহর নামে খাদ্য প্রার্থীকে দিতেন। এ কেমন মূর্খতা যে, একদিকে খোদাকে নিজের মতো মানতে মৌখিক চরম অস্বীকৃতি এবং এমন উক্তিকে সুস্পষ্ট কুফর বলে আস্ফালন আর অপরদিকে কার্যক্ষেত্রে খোদাকে নিজ অপেক্ষাও …. জ্ঞান। নাউযুবিল্লাহ ছুম্মা নাউযুবিল্লাহ’! এবার নিজেই বলুন, ‘নিজেকে খোদার সমান না তার চেয়েও বড় মনে করেন?’
কথা ও কাজের এমন গরমিল তথা ওপরে খাঁটি ধর্মপ্রাণ এবং ভিতরে চরম কুফর লালনের নফ্সানী মারাত্মক ভণ্ডামির প্রতি ইঙ্গিত করেই কুরআনে হাকীমে ইরশাদ হচ্ছে, ‘আপনি কি ওই ব্যক্তিকে দেখেছেন, যে নিজের প্রবৃত্তির চাহিদাকে আপন ইলাহ বা প্রভু স্থির করেছে’। (সূরা ফুরক্বান ৪৩ নং আয়াত)
আল্লাহ তা‘আলা মানব দেহে আক্বল, ক্বলব ও রূহের ন্যায় নফ্স নামক এক মৌলিক উপদানও দিয়েছেন। ইচ্ছাগত নড়াচড়া, অনুভূতি ও জীবনী শক্তির ধারক সূক্ষ্ম বাস্পীয় মৌলিক উপদানই নফ্স; দার্শনিকরা ওটাকে জীবাত্মা নামেই অভিহিত করে থাকেন। এটি মানুষের অন্তর ও শরীরের মধ্যবর্তী সংযোগের মাধ্যম। (সূত্র: মু’জামু ইস্তিলাহাতিস্ সূফীয়্যাহ ১১৫ পৃষ্ঠা।) এ নফ্স অবস্থা ও বৈশিষ্ট্যাবলীর ভিন্নতা হেতু ভিন্ন নামে অভিহিত এবং ভিন্ন-ভিন্ন কাজে ব্যাপৃত হয়। মানুষকে প্রবৃত্তির পূজারী হতে আল্লাহর বান্দায় উপনীত হতে হলে নফ্স বা জীবাত্মাকে কিছু ধাপ অতিক্রম করতে হয়। নিম্নে নফ্সের অবস্থাদি ও বৈশিষ্ট্যানুপাতিক স্তরসমূহ আলোচিত হবে। এ ক্ষেত্রে আমরা তিনটি পর্যায় বা নফ্সের আলোচনায় মনোনিবেশ করবো; যদিও কেউ কেউ চার কিংবা সাত প্রকার মর্মীয় মতও প্রকাশ করেছেন।
এক. নফ্সে আম্মারাহ বা কুমন্ত্রণাদাতা জীবাত্মা: এটি দৈহিক চাহিদার প্রতি আকৃষ্টকারী, শারীরিক ও ইন্দ্রীয় কামনার মন্ত্রণাদাতা, অন্তরকে অবনতির দিকে আকর্ষক। এ পর্যায়স্থ জীবাত্মাই সকল দুশ্চরিত্র ও পাপের উৎস এবং সমূহ মন্দের ঠিকানা। এ বিষয়ে কালামে পাকে ইরশাদ হচ্ছে, ‘নিশ্চয় জীবাত্মা নিশ্চিতই মন্দের কঠোর নির্দেশক’। (সূরা ইউসুফ ৫৩ নং আয়াত) এ নফ্সের গুণতো নেই কতেক দোষ আছে। যেমন- কৃপণতা, লোভ, মোহ, কাম, ক্রোধ, নির্বুদ্ধিতা, মূর্খতা, হিংসা, নিন্দা, ঘৃণা, অলসতা, আরাম আয়েশ প্রিয়তা, পরদোষ চর্চা, কুৎসা, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি। এ অবস্থা হতে উত্তরণের জন্য মশায়িখে ত্বরীকত প্রদত্ত দীক্ষাই যথাযথ ফলপ্রদ। মুরীদের অবস্থা ভেদে প্রতিষেধকও ভিন্ন-ভিন্ন হয়ে থাকে। তাই সর্বাগ্নে পীর-র্মুশিদের স্মরণাপ্ন হওয়াই জরুরি। সাধারণত ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ যিকর পীরের নির্দেশনা মতো পাঁচ লক্ষবার জপ করা যেতে পারে।
দুই. নফ্সে লাউওয়ামাহ বা অতি ভর্ৎসনাকারী মানবাত্মা: আম্মারাহ’র বৃত্ত হতে মানুষ যখন বেরিয়ে পড়ে তখন লাউয়ামাহ’র স্তরে উপনীত হয়। এ নফ্স ক্বলবের নূরে এতটুকু নূরাম্বিত হয় যে, যা অলসতার নিদ্রা হতে সাবধান করে সুতরাং জাগ্রত হয় এবং সৃষ্টি ও স্রষ্টার দু’দিকের মধ্যখানে দ্বিধাম্বিত অবস্থাদির সংশোধন শুরু করে। তখন স্বভাবগত আঁধার প্রবণতার উস্কানিতে যদি কোন পাপ সংঘটিত হয়, তবে তার প্রতিকারে খোদায়ী সতর্ককরণের নূর তড়িৎ উপস্থিত হয়। অতএব নফ্স নিজেই নিজেকে ভর্ৎসনা করে এবং ক্ষমা প্রার্থনা যোগে দয়াময় ক্ষমাশীল প্রভুর দ্বারে প্রত্যাবর্তন করে। এ নফ্স জীবাত্মার স্তর হতে মানবাত্মায় উপনীত হয়। আল্ কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘শপথ অতি ভর্ৎসনাকারী আত্মার’ (সূরা ক্বিয়ামাহ ২নং আয়াত)। এ নফ্স না পূর্ণ আলোময় না পূর্ণ আাঁধার বরং উভয়ের মধ্যবর্তী; এ স্তরেও প্রতারণা, বাসনা-কামনা, আত্মাহংকার, আত্ম-গৌরব, দাম্বিকতা, ও বদমেজাজ ইত্যাদি ক্রিয়াশীল থাকে। এ পর্যায় হতে উপনয়নের জন্য ইসমে যাত ‘আল্লাহু’ জপ উপকারি হতে পারে। তবে সর্বাবস্থায় গুরুদীক্ষিত পন্থা অবলম্বনই সর্বোত্তম।
কোন কোন সূফীয়ায়ে কেরাম তৃতীয় স্তরে মুলহিমাহ বা অনুপ্রেরণাদানকারী নফ্স মর্মে এক প্রকার সাব্যস্ত করে থাকেন। মূলতঃ এটি নফস নয় বরং আম্মারাহ, লাউওয়ামাহ ও মুত্বমাইন্নাহ নামক রাজার পরামর্শদাতা উজির আক্বলই; যা ভিন্ন-ভিন্ন রাজার কর্তৃত্বকালে ভিন্ন-ভিন্ন গুণে গুণাম্বিত হয়। কখনো শুধু মন্দ, কখনো শুধু শুভ আর কখনো শুভ-অশুভের সমন্বয়মূলক অনুপ্রেরণা নিয়ে উপস্থিত হয়। আল কুরআনে এ দিকে ইঙ্গিত করেই ইরশাদ হচ্ছে, ‘অতঃপর তার অসৎ কর্ম ও খোদাভীরুতা তাতে (নফ্সে) জাগিয়ে দিয়েছেন’ (সূরা শাম্স ৮ নং আয়াত)।
তিন: নফসে মুত্বমাইন্নাহ বা প্রশান্ত আত্মা: যা ক্বলবের আলোতে পূর্ণ আলোকিত, নিন্দনীয় গুণাবলী বর্জিত, প্রশংসনীয় চরিত্রে চরিত্রবান, আলমে কুদ্স বা পবিত্র জগত পানে অগ্রসরমান ক্বলবের সাদৃশ্যতায় ক্বলবের প্রতি পরিপূর্ণ মনোবিবেশকারী, অপবিত্রতামুক্ত এবং প্রভুমিলনের উচ্চ স্তরের অভিযাত্রী; এমনকি তার প্রভুই তাকে সম্বোধন করে বলেন, ‘হে নিশ্চিন্ত-প্রশান্তচিত্ত! স্বীয় প্রতিপালকের পানে সন্তুষ্ট ও সন্তুষ্টি অর্জিত অবস্থায় প্রত্যাগমন করো; অতঃপর আমার বিশেষ বান্দায় প্রবেশ করো এবং আমার মিলন আবাস জান্নাতে দাখিল হও’। সূরা ফজর ২৭-৩০ নং আয়াত) এ পর্যায়ে ‘হক্ব’ জপ উপকারি হতে পারে তবে গুরুর মন্ত্রই সর্ববিবেচনায় সর্বোত্তম।
কেউ কেউ আরো তিনটি পর্যায় যথাক্রমে রাদ্বিয়া বা সন্তুষ্ট, মারদ্বীয়্যাহ বা সন্তুষ্টিত ও সাফিয়াহ-কামিলাহ বা অকৃত্রিম পরিপূর্ণ সাব্যস্ত করেন। মূলতঃ এ তিনটি মুত্বমাইন্নাহর সার্বক্ষণিক অবিচ্ছেদ্য অবস্থা বিধায় পৃথক পরিচয়ে অভিহিত হওয়ার অবকাশমুক্ত। তাছাড়াও মুত্বমাইননাহ’র পর্যায় থেকে বাত্বিনে নবূয়তি মুহাম্মদী (দ.)’র দীক্ষাধীনেই উর্ধ্বারোহণ হয়ে থাকে বলে বাহ্যিক বর্ণনার প্রয়োজনীয়তা অমুখাপেক্ষী।
মোটকথা নফ্সের ধাপগুলো অতিক্রম করে আল্লাহর (বিশেষ) বান্দায় প্রবেশাধিকার লাভের একমাত্র অবলম্বন আল্লাহর দয়া। ইরশাদ হচ্ছে, ‘এবং আমি নিজেকে নির্দোষ বলছিনা, নিশ্চয় নফ্স-রিপু মন্দকাজের কঠোর নির্দেশদাতা, পরন্তু যার প্রতি আমার প্রতিপালক দয়া করেন; নিশ্চয় আমার রব পরম ক্ষমাশীল- অতি দয়ালু’। (সূরা ইউসুফ ৫৩ নং আয়াত) ক্ষমাশীল দয়ালু প্রভুর দয়া লাভের এক সুবর্ণ সুযোগই হলো মাহে রমদ্বান। কেননা এ মাসে আল্লাহর দয়ার দ্বার সদা উম্মুক্ত থাকে। রাসূলুল্লাহ (দ.) ইরশাদ করেন, ‘রমদ্বান মাস এলে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়, (অন্য বর্ণনায় ‘রহমতের দ্বারসমূহ খুলে দেওয়া হয়’ রয়েছে) জাহান্নামের দরজাসমূহ রুদ্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানকে জিঞ্জিরাবদ্ধ করে দেওয়া হয়’। (মুসলিম শরীফ, কিতাবুস সিয়াম ২৩৯১-২৩৯২-২৩৯৪ নং হাদীস) তিরমিযী শরীফের বর্ণনায় মুসলিম শরীফের উক্ত বর্ণনার পর আরো রয়েছে, ‘এক আহ্বানকারী আহ্বান করতে থাকেন, ‘হে কল্যাণকামী অগ্রসর হও, হে মন্দ অন্বেষী থাম’। হাদীসে পাকে আরো বিবৃত হয়েছে, হযরত সালমান ফার্সী (রা.) বর্ণনা করেন, “একবার শা’বানের শেষ দিনে রাসূলুল্লাহ (দ.) আমাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। উক্ত ভাষণে তিনি (দ.) বলেন, ‘হে লোকেরা! এক মহান ও প্রাচুর্য মণ্ডিত মাস তোমাদের ওপর ছায়া বিস্তার করেছে, যাতে হাজার মাস হতে শ্রেয় এক রজনী রয়েছে; আল্লাহ তা‘আলা যার রোযা ফরয করেছেন এবং রাতে নামায নফল করেছেন। যে ব্যক্তি এ মাসে একটি নফল পুণ্যকাজের মাধ্যমে আল্লাহর নিকটবর্তী হবে, সে অন্য মাসে ফরয আদায়কারীর মত হবে আর যে ব্যক্তি এ মাসে একটি ফরয আদায় করবে, সে অন্য মাসে সত্তরটি ফরয আদায়কারীর সমান হবে। এটি ধৈর্যের মাস, আর ধৈর্যের বিনিময় জান্নাত। এটি পারষ্পরিক সহানুভূতির মাস এবং এটি ওই মাস যাতে মু’মিনের রিয্ক বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এ মাসে যে ব্যক্তি একজন রোযাদারকে ইফতার করাবে, তা তার পাপ মার্জনা ও নরকাগ্নি হতে মুক্তির কারণ এবং রোযাদারের সাওয়াবে বিন্দু পরিমাণ হ্রাস ব্যতীত তাকে রোযাদারের সমান সাওয়াব দেওয়া হবে’। আমরা বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের প্রত্যেকে তো এমন সামর্থ্য রাখিনা, যদ্বারা রোযাদারকে ইফতার করাবো’। অতএব রাসূলুল্লাহ (দ.) বললেন, ‘আল্লাহ এ সাওয়াব ওই ব্যক্তিকেও দান করবেন, যে ব্যক্তি এক ঢোক দুধ অথবা একটি খেজুর অথবা এক ঢোক পানি দ্বারা ইফতার করায়। যে ব্যক্তি রোযাদারকে তৃপ্তিসহ ভোজন করাবে, আল্লাহ তাকে আমার হাউজ হতে পানীয় পান করাবেন; সুতরাং জান্নাতে প্রবেশ পর্যন্ত সে তৃষ্ণার্ত হবেনা। এটা এমন এক মাস, যার প্রথমাংশ রহমত, মধ্যমাংশ মাগফিরাত ও শেষাংশ নরক হতে মুক্তি। যে ব্যক্তি এ মাসে নিজের দাস-দাসীদের কাজের চাপ হাল্কা করবে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা ও জাহান্নাম হতে পরিত্রাণ দিবেন”। (মিশকাতুল মাসাবীহ ১৭৩-১৭৪ পৃষ্ঠা) হাদীসে পাকে আরো রয়েছে, ‘হযরত আনাস বিন মালিক (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রমদ্বান মাস এলে রাসূলুল্লাহ (দ.) ইরশাদ করেন, এ মাস তোমাদের দ্বারে উপস্থিত, এতে একটি রাত রয়েছে; যা হাজার মাস (৮৩ বছর ৪ মাস) অপেক্ষা উত্তম। যে ব্যক্তি তা হতে বঞ্চিত হয়েছে, সে সর্বকল্যাণ বঞ্চিত হয়েছে আর প্রত্যেক চির বঞ্চিত ব্যক্তি ব্যতীত কেউ এর কল্যাণ বঞ্চিত হয় না’। (ইবনু মাজাহ শরীফের উদ্ধৃতিতে মিশকাতুল মাসাবীহ ১৭৩ পৃষ্ঠা)।
এ-তো গেল, এক সুবর্ণ সুযোগ ও তদপ্রতি আগুয়ানের আহ্বান এবং তা অবজ্ঞায় হারানোর বঞ্চনার বর্ণনা। ওই সুযোগ কাজে লাগানোর রীতি-পদ্ধতিও বিবৃত হওয়া জরুরি। ইরশাদে মুস্তাফ্বী (দ.)’র আলোকে এবার সেদিকে মনোনিবেশ করা যাক। ইরশাদ হচ্ছে, ‘যে ব্যক্তি ঈমান (আস্থা-বিশ্বাস) ও ইহতিসাব (হিসেব-নিকেষ-মূল্যায়ন) এর সাথে রমদ্বান মাসের রোযা রাখে, তার অতীতের গুনাহ মার্জনা হবে। যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিসাবের সাথে রমদ্বানের রাতে ইবাদত-বন্দেগীতে প্রতিষ্ঠিত থাকে, তার পূর্বের সমূদয় পাপ ক্ষমা হবে। যে ব্যক্তি লায়লাতুল ক্বদরে আস্থা-বিশ্বাস ও আত্মমূল্যায়নের মাধ্যমে ক্বলব, রূহ ও নফ্স সহযোগে আল্লাহতে নিমগ্ন থাকে, তার অতীতের যাবতীয় পাপ মার্জনা হবে। (সূত্র: বুখারী শরীফ ১ম খণ্ড, ২৭০ পৃষ্ঠা; মিশকাতুল মাসাবীহ ১৭৩ পৃষ্ঠা)। আরো ইরশাদ হচ্ছে, ‘রাসূলুল্লাহ (দ.) ফরমান, আদম সন্তানের প্রতিটি পুণ্যকাজ দশ থেকে সাত শত গুণ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধ করা হয়। আল্লাহ বলেন, পরন্তু রোযা ব্যতীত; কেননা তা (রোযা) আমারই জন্য এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দিব বা নিজেই এর প্রতিদান। সে (রোযাদার) আমারই নিমিত্তে প্রবৃত্তি ও পানাহার বর্জন করে। রোযাদারের জন্য দু’টি আনন্দ, একটি ইফ্তারের সময় এবং অপরটি তার প্রভুর সাথে সাক্ষাত কালে। রোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মিশকের সুগন্ধি অপেক্ষা অধিক নির্মল সুগন্ধময়। রোযা ঢাল স্বরূপ। সুতরাং তোমাদের কারো রোযা হলে তবে সে অশ্লীল কথা-কর্ম ও গণ্ডগোল করবেনা। যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা ঝগড়া করে, তবে সে যেন আমি রোযাদার বলে’। (মুসলিম শরীফ ২৬০২ ও ২৬০৩ নং হাদীস; মিশকাতুল মাসাবীহ শরীফ ১৭৩ পৃষ্ঠা)
এবার আমাদের রোযার প্রকৃতি মূল্যায়ন করে দেখা যাক। আমরা কোন প্রকারের রোযাদার? আমাদের রোযা কি কেবল ক্ষুধা-পিপাসার কষ্ট, নাকি রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত লাভের সুখ শান্তি, নাকি প্রভু-মিলনের পরম আনন্দে ভরপুর? এ ক্ষেত্রে ইমাম গজ্জালীর দার্শনিক বর্ণনা প্রণিধানযোগ্য। ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন কিতাবের ভাষায়, ‘রোযার তিনটি পর্যায় রয়েছে। যথা- (ক) সাধারণের রোযা, (খ) বিশেষের রোযা ও (গ) বিশেষ অতি বিশেষের রোযা।
(ক) সাধারণের রোযা: ইবাদতের নিয়্যতে সুব্হে সাদিক হতে সূর্য অস্তমিত হওয়া পর্যন্ত পেট ও যৌনাঙ্গকে প্রবৃত্তি নিবৃত্ত রাখা। এ শ্রেণীর রোযাদারের রোযা ক্ষুধা-পিপাসার দুর্ভোগ বিহীন কিছুই নয়। হাদীসে পাকে ইরশাদ হচ্ছে, ‘বহু রোযাদার এমনও রয়েছে, যাদের রোযা হতে ক্ষুধা-পিপাসা ছাড়া কিছুই অর্জিত হয়না’। হাদীস শরীফে আরো ইরশাদ হচ্ছে, ‘যে বক্তি মিথ্যা-প্রতারণামূলক কথা ও কাজ বর্জন করেনি, তার পানাহার বিরতিতে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই’।
(খ) বিশেষের রোযা: চক্ষু, কর্ণ, রসনা, হস্ত, পদ ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে পাপকাজ হতে বিরত রাখা; এ পাপ বর্জন ছয়টি কর্মের মাধ্যমে পরিপূর্ণতা পায়। প্রথমত: ক্বলবকে আল্লাহর স্মরণ বিচ্যুত ও অন্য কিছুতে নিমগ্ন করে এমন সমুদয় বস্তু এবং দোষণীয় ও নিন্দনীয় সকল জিনিষ দর্শনে দৃষ্টি অবনমিত ও বিরত রাখা। রাসূলুল্লাহ (দ.) ইরশাদ করেন, ‘দৃষ্টি অভিশপ্ত ইবলিসের তীরসমূহের এক বিষাক্ত তীর। অতএব যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে তা পরিহার করে, আল্লাহ তাকে ঈমান দান করেন; যার স্বাদ ক্বলবে পায়’। আরো ইরশাদ হচ্ছে, ‘পাঁচটি বস্তু রোযাদারের রোযা ভঙ্গ করে; মিথ্যা, পরনিন্দা, চুগলি, মিথ্যা শপথ ও কামাতুর দৃষ্টি’। দ্বিতীয়ত: রসনাকে বিদ্রুপ , মিথ্যা, গীবত, চুগলি, অশ্লীলতা, রূঢ়তা, ঝগড়া ও গল্প গুজব হতে সংরক্ষণ করা। নীরবতা, আল্লাহর যিকর ও তিলাওয়াতে কুরআন ইত্যাদিই জিহ্বার রোযা। তৃতীয়: সর্ব প্রকার মন্দ শ্রবণ হতে কানকে নিবৃত্ত রাখা। কেননা যা বলা হারাম, তা সমনোযোগ শুনাও হারাম। চতুর্থ: হাত, পা ও অন্যান্য অঙ্গকে পাপ কাজ হতে বিরত রাখা এবং ইফ্তারের সময় সন্দেহ ভাজন আহার হতে পেটকে নিবৃত্ত রাখা। দিবসে হালাল বস্তুসমূহের পানাহার বর্জন করে হারামে ইফ্তার করলে রোযার কোন মানেই থাকেনা। এমন ব্যক্তির দৃষ্টান্ত, একটি শহর ধ্বংস করে একটি গৃহ নির্মাণকারীর ন্যায়। কেননা হালাল খাদ্য অতিমাত্রা হেতু ক্ষতিকর, প্রকৃতিগত নয়; অতএব তা হ্রাস করণার্থেইে রোযা। ক্ষতির আশঙ্কায় অতিমাত্রায় ঔষধ সেবন বর্জনকারীর তদপরিবর্তে বিষ ভক্ষণ বোকামি বৈকি! বস্তুতঃ হারাম দ্বীনের প্রাণ-বিধংসী বিষ, আর হালাল ঔষধ; অল্পে উপকারি আর অতিতে ক্ষতিকর। পক্ষান্তরে আহারের হ্রাস করণই রোযার উদ্দেশ্য। পঞ্চম: ইফ্তারের সময় হালাল খাদ্যও উদর পরিপূর্ণ ভর্তি হয় এমনভাবে অতিভোজন না করা। আল্লাহর কাছে পাত্রসমূহে হালালে পরিপূর্ণ পেট অপেক্ষা অধিক ক্রোধকর আর কোন পাত্র নেই। আল্লাহর শত্রু কি করে রোযায় উপকৃত হতে পারে। দিবসের খাদ্য-ঘাটতি ইফ্তারে পুষিয়ে নিলে কিংবা রকমারি আহার্যে আরো বাড়িয়ে নিলে তবে প্রবৃত্তি ধ্বংস হবে কী করে? এমনকি আজকাল রমদ্বান মাসের জন্য নানাবিধ খাদ্য জমা করে রাখা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, যাতে কয়েক মাসে যা খায়নি, তা একটি মাসেই খেতে পারে! অথচ সর্বজন বিদিত যে, রোযার উদ্দেশ্য হল, খোদাভীতিতে নফ্সকে সবলতর করার জন্য প্রবৃত্তি নির্মূলই। পাকস্থলিকে মধ্যাহ্ন ভোজের সময় হতে নৈশ ভোজের সময় পর্যন্ত তাড়ন করা হলে এমনকি তার প্রবৃত্তি উত্তাল হয়ে ওঠে এবং খাদ্যাগ্রহ প্রবল হয়। এমতাবস্থায় পরিতৃপ্ত হয়ে স্বাদ ও পুষ্টিতে ভরা আহার্য ভোজন করা হলে দৈহিক শক্তির বৃদ্ধি হেতু প্রবৃত্তি খ্যাপাটে হয়ে ওঠে; অথচ তা স্বাভাবিক অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হলে মন্থরই থাকত। রোযার প্রাণ ও গুপ্ত রহস্য হল, মন্দে প্রত্যাবর্তনে শয়তানের বাহন শক্তিকে দুর্বল করা; আর তা রোযা ছাড়া অন্যান্য সময়ের প্রাত্যহিক নৈশ ভোজন অপেক্ষা হ্রাস করা ব্যতীত কখনো অর্জিত হয়না। পক্ষান্তরে মধ্যাহ্ন ও নৈশ ভোজ একত্রিত করে দু’বেলার খাওয়ার এক বেলায় ইফ্তারে ভোজন করা হলে, রোযা দ্বারা উপকৃত হওয়া বাস্তবতা বর্জিত কল্পনায় পর্যবসিত হবে। বরং উত্তম রীতি হলো, দিবসে দীর্ঘ ঘুম পরিত্যাগ করা, যাতে দুর্বলতা ও ক্ষুধা-পিপাসা অনুভূত হয়। এমতাবস্থায় ক্বলব স্বচ্ছ হতে থাকে। নফ্সের দুর্বলতার মাত্রাবৃদ্ধি প্রতি রাত অব্যাহত থাকলে তাহাজ্জুদ ও অন্যান্য ইবাদত-বান্দেগী করা সহজতর হয়। সুতরাং শয়তান তার অন্তরে পরিভ্রমণ করতে পারেনা। অতএব সে উর্ধ্বলোক দেখতে পায়। আর লায়লাতুল ক্বদর ওই রাত, যাতে উর্ধ্বলোকের বিষয়াবলী উন্মুক্ত হয়; আল্লাহর বাণী ‘নিশ্চয় আমি এটা লায়লাতুল ক্বদরে অবতীর্ণ করেছি’ এর মর্ম এটাই। আর যে ব্যক্তি আপন ক্বলব ও বক্ষের মধ্যখানে খাদ্যের অন্তরায় সৃষ্টি করে রেখেছে, সে তা থেকে পর্দাবৃত থাকবে। ওই পর্দা অপসারণে কেবল পাকস্থলী খালি করা যথেষ্ট নয়; যদিনা তার ইচ্ছা-আকাঙ্খা সংকল্প আল্লাহ ভিন্ন হতে খালি না হয়। এটিই কাজের কাজ আর ওই সবের সূচনাই স্বল্প ভোজন। ষষ্ঠ: ইফ্তারান্তে রোযাদারের অন্তর নৈরাশ্য ও আশায় অস্থির থাকা; যেহেতু সে জানেনা যে, তার রোযা কি কবুল হয়েছে, না প্রত্যাখ্যাত হয়েছে? সে কি নৈকট্য প্রাপ্তদের অন্তর্ভূক্ত না বঞ্চিতদের?
বিশেষ অতি বিশেষের রোযা: ক্বলবকে আল্লাহ ভিন্ন সবকিছুর ধ্যান থেকে সম্পূর্ণ বিরত রাখা। আল্লাহ ভিন্ন অন্যের চিন্তায় এ রোযা ভঙ্গ হয়। এ রোযার বিস্তারিত ব্যাখ্যায় বাচালতা নয় বরং বাস্তবায়নে কর্মচঞ্চলতাই প্রয়োজন। কেননা এটা আল্লাহতে ইচ্ছা-আকাংক্ষা-সংকল্পের বৈশিষ্ট্য যোগে অগ্রগমন, গাইরুল্লাহ হতে প্রস্থান ও আল্লাহর বাণী ‘বলুন, ‘আল্লাহ’ অতঃপর তাদেরকে ছেড়ে দিন, তাদের অনর্থক কাজে খেলতে’ এর মর্মালোক চরিত্র গড়ার মাধ্যমে পূর্ণতা পায়।
কথায় বলে, ‘চেষ্টান্তে দুঃখ খণ্ডে’। আমাদের ও চেষ্টা-প্রচেষ্টা করতে হবে, প্রকৃতার্থে রোযাদার হওয়ার। ইরশাদ হচ্ছে, ‘এবং যারা আমাতে প্রচেষ্টা করে, অবশ্যই আমি তাদেরকে আমার পন্থাসমূহ দেখাব; নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মপরায়নদের সাথে আছেন’। (সূরা আনকাবূত ৬৯ নং আয়াত) আরো ইরশাদ হচ্ছে, ‘হে মু’মিনগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে (আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠায়) সাহায্য করো, তবে আল্লাহ তোমাদের (বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ শত্রুর (মোকাবিলায়) সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পদসমূহ সুদৃঢ় করে দিবেন’। (সূরা মুহাম্মদ ৭নং আয়াত)
রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের এ মাসে প্রকৃতার্থে সওমব্রত পালনের মাধ্যমে যদি আল্লাহর দয়াধন্য হয়ে নফ্সকে পবিত্র পরিশুদ্ধ করতে পারি, তবে সফলকাম হতে পারবো, অন্যাথায় ব্যর্থতার ষোলকলাই পূর্ণ হবে। ইরশাদ হচ্ছে, ‘নিশ্চয় সফল হয়েছে, যে তাকে (নফ্সকে) পবিত্র করেছে। এবং অবশ্য ব্যর্থ হয়েছে, যে তাকে (নফ্সকে) ভ্রষ্টতায় আচ্ছন্ন করেছে’। (সূরা শামস ৯-১০ নং আয়াত)। রহমান রহীম আল্লাহ তা‘আলা রহমতুল্লিল আলামীন (দ.)’র উসিলায় তাঁর অসীম দয়ায় আমাদেরকে উভয়কূলের সফলতায় ধন্য করুন।

Share Button

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *