শবে বরাত রজনীতে আমল সমুহ

শবে-বরাত সৌভাগ্য রজনী। বিভিন্ন হাদিসে রসূলুল্লাহ (সা.) এ রাতের অপূর্ব মহিমা ও সৌভাগ্যের বর্ণনা দিয়েছেন। বিশেষভাবে এই সুসংবাদও প্রদান করেছেন যে, এ রাতে মহান আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে অবতীর্ণ হয়ে ফজর পর্যন্ত অবস্থান করেন। এ রাতের আমল সর্ম্পকে হযরত আলী (রা.) রসূলুল্লাহ (সা.)-এর জবনী বর্ণনা করেন, যাতে তিনি বলেন, শাবান মাসের পনেরো (১৫ তারিখ) তম রাত তোমরা জাগ্রত থাক। আল্লাহর এবাদত বন্দেগীতে আত্মনিয়োগ করো এবং পরের দিন রোজা রাখো। এ রাত আল্লাহতা’লা মাগরিবের সময় থেকেই দুনিয়ার আসমানে অবতীর্ণ হন এবং বলতে থাকেন কেউ আছ কি যে আমার নিকট মাগফিরাত তলব করবে, যা আমি ক্ষমা করে দেব, কেউ রুজি-রোজগারের প্রার্থনাকারী আছে কি, যাকে আমি অধিক দান করব, কোনো বিপদগ্রস্ত আছে কি, যাকে আমি বিপদমুক্ত করব। এভাবে ফজর হওয়া পর্যন্ত আল্লাহতা’লা তাঁর করুণা প্রদানের জন্য জিজ্ঞাসা করতে থাকেন। (ইবনেমাজা ও বায়হাকী)

হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, শাবানের পনেরোতম রাত্রে আহ্বান আসে, মাগফিরাত তলবকারী কেউ আছে কি, যাকে আমি ক্ষমা করে দেব, কোনো সায়েল (প্রার্থনাকারী) আছে কি, যার দামান আমি উদ্দেশ্যের মুক্তা দিয়ে পরিপূর্ণ করে দেব এবং আল্লাহতা’লা প্রত্যেক প্রার্থনাকারীর দোয়া কবুল করেন।

রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ

যে ব্যক্তি পাঁচটি রাত্রে জাগ্রত থাকবে তাঁর জন্য জান্নাত অবধারিত হয়ে যাবে।

১. রজব মাসের ১ম রাত ২. আশুরার রাত ৩. ঈদুল আজহার রাত ৪. ঈদুল ফিতরের রাত ৫. শাবানের পঞ্চদশ রজনী।

সুত্রঃ মুনযিরী রচিত তারগীব ওয়াত তারহীবঃ খ-২, পৃ-১৫২

এ কারণেই ফিকহের ইমামগণের অনেকে শাবানের পঞ্চদশ রাতে জাগরণ থাকাকে মুস্তাহাব বলে উল্লেখ করেছেন। (যার বিবরণ পূর্বে দেয়া হয়েছে) হযরত ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত আছেঃ

হযরত ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেনঃ পাঁচটি রজনীতে দুআ করা হলে তা কখনো ফেরত দেয়া হয় না (অবশ্যই ক্ববুল হয়) জুমআর রাত্র, রজবের প্রথম রাত, শাবানের পঞ্চদশ রাত এবং দুই ঈদের রাত।

সুত্রঃ – ইমাম বায়হাকী তাঁর শুয়াবুল ঈমানে; আব্দুর রাজ্জাক তাঁর মুসনাদে

শবে বরাত একটি মহিমান্বিত রজনী। এ রাতে আল্লাহতায়ালা তাঁর রহমতের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন, পাপী-তাপী বান্দাদেরকে উদারচিত্তে ক্ষমা করেন, জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন- এ জন্য এ রাতকে শবে বরাত বলা হয়। হাদিস শরীফে এ রাতটিকে ‘নিসফে শাবান’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ শাবান মাসের মধ্যবর্তী রজনী তথা ১৪ তারিখ দিবাগত রাত্রি। মুসলিম উম্মাহর কাছে এ রাতটি খুবই গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ।

শাবান মাস হলো বিশেষ মর্যাদাবান। মোবারক মাহে রমজানের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে এ মাসটি। রমজানের প্রস্তুতির জন্য এ মাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাসূল (সা.) এ মাসে বেশি বেশি নফল ইবাদত করতেন। অন্যান্য মাসের চেয়ে এ মাসে নফল রোজা বেশি রাখতেন। হযরত আয়শা সিদ্দিকা (রা.) বলেছেন- ‘আমি রাসূল (সা.)-কে রমজান ব্যতীত অন্য কোনো মাসে পূর্ণ এক মাস রোজা রাখতে দেখিনি। কিন্তু তিনি শাবান মাসে সবচেয়ে বেশি নফল রোজা রেখেছেন।’ (সহি মুসলিম)।

এ মাসের ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে রাসূল (সা.) বলেছেন- ‘রজব আল্লাহর মাস, শাবান আমার মাস এবং রমজান হলো উম্মতের মাস। রাসূল (সা.) রজব, শাবান মাসের অত্যধিক গুরুত্ব ও তাৎপর্যের প্রতি লক্ষ রেখে ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফী রাজাবা ওয়া শা’বান, ওয়া বাল্লিগনা রামাদান’- এ দোয়াটি বেশি বেশি পড়তেন এবং উম্মতকে পড়ার জন্য অনুপ্রাণিত করতেন। যার অর্থ হচ্ছে- ‘হে আল্লাহ! আমাদেরকে রজব ও শাবানের সকল বরকত দান করুন এবং রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।’ এ মাসে রয়েছে বিশেষ ফজিলতময় শবে বরাত।

বিভিন্ন হাদিসে শবে বরাতের বিশেষ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। হযরত আয়শা (রা.) বর্ণনা করেন- কোনো এক শাবানের অর্ধরাতে রাসূল (সা.)-কে বিছানায় পাওয়া যাচ্ছিল না। খুঁজে দেখা গেল তিনি জান্নাতুল বাকিতে কবর জিয়ারত করছেন। (সহি মুসলিম)।

আরেক হাদিসে হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূল (সা.) বলেছেন, যখন অর্ধশাবানের রাত আসে তখন তোমরা রাত জেগে ইবাদত করো এবং পরের দিনটিতে রোজা রাখো। কেননা এ রাতে আল্লাহ তায়ালা সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর আকাশে অবতরণ করেন এবং বলতে থাকেন, কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব। কোনো রিজিক প্রার্থী আছে কি? আমি তাকে রিজিক দান করব। কোনো বিপদগ্রস্ত আছে কি? আমি তাকে বিপদমুক্ত করব। আর সুবহে সাদিক পর্যন্ত এ ডাক অব্যাহত থাকে। (ইবনে মাজাহ)।

হযরত ইকরিমা (রা.)-সহ প্রমুখ তাফসিরবিদের মতে, আল কুরআনে সূরায়ে দোখানের প্রথম আয়াতগুলোতে শবে বরাতের ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে। কোনো কোনো বর্ণনায় এ রাতকে ‘লাইলাতুসসফ’ নামে অভিহিত করা হয়েছে এবং এর বরকতময় হওয়া ও রহমত নাযিল হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

কেউ কেউ শবে বরাত সম্পর্কিত কিছু হাদিসকে দুর্বল বলে একেবারেই অস্বীকার করে ফেলেন। এটা মোটেই উচিত হবে না। কারণ, একই বিষয়ে একাধিক হাদিস বর্ণিত হলে এর গ্রহণযোগ্যতায় আর কোনো প্রশ্ন থাকে না। ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনায় শবে বরাতের বরকত ও ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। ঢালাওভাবে সবগুলো হাদিসকে দুর্বল বলে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তা ছাড়া হাদিস শাস্ত্রের মূলনীতি অনুযায়ী ফজিলতের হাদিসগুলো দুর্বল হলেও পালনযোগ্য।

মুসলিম উম্মাহর তিনটি স্বর্ণোজ্জ্বল যুগ তথা সাহাবা, তাবেঈন ও তাবে তাবেঈনের যুগেও এ রাতের ফজিলত থেকে উপকৃত হওয়ার বিশেষ গতি ও গুরুত্ব ছিল। সেই যুগের মানুষেরাও এই রাতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ইবাদত-বন্দেগি করেছেন। এ রাতটি বিশেষ ফজিলতময় ও গুরুত্ববহ। তাই এ রাতে দীর্ঘক্ষণ জেগে থাকা ও ইবাদত করা সওয়াবের অছিলা হিসেবে গণ্য হবে নিঃসন্দেহে।

শবে বরাত বিশেষ ফজিলতময় হওয়ায় ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হন। নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, তাসবিহ পাঠ, জিকির-আজকার, তাওবা-ইস্তেগফার করে নিজেদের পাপ-পঙ্কিলতা থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। আত্মীয়স্বজনের কবর জিয়ারত করেন এবং তাদের মাগফিরাত কামনায় দোয়া করেন।

অধিক নফল নামাজ পড়া, কুরআন তেলাওয়াত করা, তাসবিহ পড়া, দোয়া করা; এসব ইবাদত এই রাতে করা যায়। কোনো কোনো হাদিসের আলোকে শাবান মাসের পনেরো তারিখ অর্থাৎ, বরাত রজনীর পরের দিন নফল রোজা রাখা অনেক সওয়াবের কাজ।

এই রাতে আরেকটি বিশেষ আমল রয়েছে, যা একটি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। তা হলো, রাসূল (সা.) এই রাতে একবার জান্নাতুল বাকিতে গিয়েছিলেন। যেহেতু রাসূল (সা.) জান্নাতুল বাকিতে গিয়েছিলেন এই রাতে, তাই মুসলমানরাও এই রাতে কবরস্থানে যাওয়ার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে আসছেন।

Share Button

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *